একনেকে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, বাস্তবায়িত হচ্ছে পানি সংকটের কৌশলগত সমাধান
শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি সংকট দূর করতে, নদীগুলোকে সচল করতে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সরকার বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে [০.৫.১, ০.৫.২]। রাজবাড়ীর পাংশায় প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রেখে সেচ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

১৩ মে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১১ নম্বর হিসেবে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে, এমনটাই নিশ্চিত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের নথি থেকে জানা গেছে, ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট হারে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ি পাম্প হাউজ, জি-কে সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ বজায় রাখা হবে।
সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর নিট চাষযোগ্য জমিতে পানির সংস্থান নিশ্চিত করা হবে। এতে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ প্রকল্প থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন হবে।
এছাড়া ব্যারেজের ডেক বা করিডরকে বহুমুখী অবকাঠামোগত সংযোগ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মৎস্য উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাস্তবায়নকালে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জনের জন্য ১২ কোটি ২৫ লাখ জন-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সাতটি স্যাটেলাইট শহর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি এবং প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ একর এলাকায় দেড় লাখ পরিবারের জন্য আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন গ্রামীণ টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে জিডিপিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল মিলিয়ে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার রিটার্ন আসতে পারে বলে প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) সাবেক মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, “এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশসম্মত উন্নয়নের কেন্দ্রীয় সমাধান হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই ব্যারেজ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এবং কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও পরিবেশ খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।”
Awaz News



