জাতীয়

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসায় সরকার বহুবিধ উদ্যোগ নিয়েছে, জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী

“অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের সুচিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। এছাড়া, অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় একীভূতকরণ এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেও সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

আজ সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের নিজ দফতরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, অটিজম একটি জন্মগত নিউরোলজিক্যাল সমস্যা, তবে এটি কখনো রোগ হিসেবে দেখা যায় না। দেশের অটিজম আক্রান্ত শিশু ও ব্যক্তিদের বিশেষ সক্ষম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে সম্পৃক্ত করার জন্য বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, ‘অটিজম আক্রান্ত শিশুরা স্বাভাবিক জীবনের মতো শিক্ষা ও সেবার অধিকার পায়। তাদের বিশেষ সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষা, ফিজিওথেরাপি, প্যারেন্ট কাউন্সেলিং এবং অন্যান্য সহায়তা কার্যক্রম প্রদান করা হচ্ছে। আমরা চাই তারা শুধু শিক্ষা ও চিকিৎসার সুবিধা পাবে না, বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে দেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে অটিজম আক্রান্ত শিশু ও ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় তাদের জন্য গ্রান্ট এবং অন্যান্য সহায়তা বাড়াচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আমরা চাই অটিজম আক্রান্তরা তাদের বিশেষ দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে। এতে তারা নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করতে পারবে এবং সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, অটিজম আক্রান্তদের জন্য সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই কার্যকরভাবে চালু রয়েছে। তবে শিক্ষার মান আরও বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিশেষ শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যক্রম, এবং নতুন শিক্ষণ কৌশল প্রবর্তন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২০ জন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নয়ন করা হচ্ছে এবং শিক্ষকরা বিশেষ শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী কার্যকর শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছেন।

তিনি জানান, এছাড়াও অটিজম ও অন্যান্য মানসিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য (একটিভিটি অফ ডেইলি লিভিং) প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৫০০ জন শিশু ও পরিবারের সদস্যরা এ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা দৈনন্দিন জীবনের মূল কাজগুলো স্বাধীনভাবে করতে শিখছে, যা তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ডাক্তারদের জন্যও বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ সালে ৫১ জন ডাক্তার এবং ২০২৪-২৫ সালে ৫৩ জন ডাক্তার অটিজম এবং অন্যান্য মানসিক/শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পরিচর্যা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অটিজম সংক্রান্ত সেবা আরো সুসংগঠিতভাবে প্রদান করা সম্ভব হবে।

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যও সরকারের নজরদারির মধ্যে রয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, অটিজম আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলো প্রায়শই মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে মেন্টাল হেলথ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আমরা বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছি, যাতে পরিবারের সদস্যরা কাউন্সেলিং এবং মানসিক সহায়তা পায়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারগুলো মনে করবে যে তাদের সন্তান স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। এতে তারা সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারবে। সরকারি এই উদ্যোগটি প্রাইভেট খাতের তুলনায় কম খরচে প্রদান করা হচ্ছে, যাতে সর্বসাধারণ এই সেবা গ্রহণে সক্ষম হয়।

সরকার শুধু অটিজম নয়, বিশেষভাবে সক্ষম সকল ব্যক্তির জন্য বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম গ্রহণ করছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিজিক্যালি ডিজেবল, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং অন্যান্য মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও শিক্ষাগত, সেবাগত এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এটি একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৪টি ‘অটিজম ও ইনডিভিজুয়াল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ কার্যকর রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোতে ২ লাখ ৬০ হাজার ১৯৬ জন ব্যক্তি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেছে এবং মোট ১২ লাখ ৩৯ হাজর ৮২০টি সেবা প্রদানের রেকর্ড রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, এই কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষাগত কার্যক্রম, ফিজিওথেরাপি, পেশাগত প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অটিজম ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ বাড়াচ্ছে। ঢাকায় দু’টি প্রধান সেন্টার চালু রয়েছে, যেখানে শিশু ও যুবকদের জন্য অকুরপেশিয়াল ডথ, ল্যাঙ্গুয়েজ ডথ, সোশিয়াল কোঅর্ডিনেশন এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কার্যক্রম চালু আছে। এছাড়াও, সহায়ক উপকরণ সরবরাহ এবং পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

সরকারি প্রকল্পগুলোর আওতায় প্রতিবন্ধী শিশুরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে, যার মধ্যে রয়েছে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, দৈনন্দিন জীবনযাপন দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শুধু শিক্ষিত নয়, বরং সক্ষম ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠুক। এতে তারা দেশের অর্থনীতি ও সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডিজেবল স্পোর্টস এবং প্যারাঅলিম্পিক কার্যক্রমকে আরও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় এবং তাদের আত্মবিশ্বাস উন্নত করে। পাশাপাশি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, অটিজম আক্রান্ত শিশুদের স্বাভাবিক সন্তানের মতো গ্রহণ করতে হবে। কোনো ধরনের কলঙ্ক বা সামাজিক স্টিগমা না তৈরি করতে পরিবার ও সমাজকে সচেতন হতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা চাই অটিজম আক্রান্ত শিশুরা যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, শিক্ষার সুযোগ পায় এবং সমাজের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধুমাত্র সরকারের নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব।

প্রতিমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, অটিজম ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রজেক্টও কার্যক্রম চালু রেখেছে। এটি একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, যা শিক্ষার মান, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করে। এছাড়াও পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

তিনি দেশবাসীর প্রতি পুনরায় আহ্বান জানিয়েছেন, অটিজম আক্রান্ত শিশুরা আমাদের সন্তান। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ দেয়া এবং সামাজিক কলঙ্ক দূর করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। সরকারের উদ্যোগ এবং সমাজের সমর্থনের মাধ্যমে তারা স্বাধীন, সক্ষম এবং সম্পূর্ণভাবে সমাজের অংশ হয়ে উঠতে পারবে।

সূত্র : বাসস

Awaz News

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button